স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের জন্য ২৪ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখ পূর্বনির্ধারিত। উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতিকাল আরো তিন বছর বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ আবেদন করেছে।
উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের রফতানি খাতে আনতে হবে টেকসই পরিবর্তন। সে লক্ষ্যে সরকার ও প্রাইভেট সেক্টরকে সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, ব্যবসা পরিচালনার খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংক সুদহার ডাবল ডিজিটে বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের রফতানি খাত। বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা ও শুল্ক, পশ্চিমা বাজারে (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ) চাহিদা হ্রাস, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধ এবং শুল্কের চাপ রফতানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। পোশাক রফতানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে এ ঝুঁকি আরো বেশি বেড়েছে। তাই রফতানি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই।
চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত হওয়া সত্ত্বেও নানাবিধ প্রতিকূলতার কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) রফতানি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৭০ মিলিয়ন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ০.২ শতাংশ বেশি। চামড়াজাত পণ্য ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এ সময়ে চামড়ার রফতানি ২.১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, চামড়াজাত পাদুকার রফতানি ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮৭ মিলিয়ন ডলার এবং অচামড়াজাত পাদুকার রফতানি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯১ মিলিয়ন ডলার। শুধু চামড়াজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে রফতানি আয় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৪ মিলিয়ন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নয় মাসে সরকারের চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পের কৌশলগত রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ৯৪৫ মিলিয়ন ডলার হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৭ শতাংশ কম অর্জিত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দুরূহ হয়ে পড়বে। এমতাবস্থায় অত্র খাতে ব্যবসাবান্ধব নীতিসহায়তা ও এর ধারাবাহিকতা না থাকলে এ শিল্প খাত চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং এ খাতের জন্য এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতি আরো বাধাগ্রস্ত হবে। এ বাস্তবতায় চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পকে চাহিদা মোতাবেক দ্রুত নীতিসহায়তা প্রদান ও তার বস্তবায়নে সরকারকে গুরুত্বারোপ করতে হবে। তাই আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কেবল প্রথাগত বরাদ্দ নয়, প্রয়োজন বাস্তবমুখী, সাহসী ও কাঠামোগত সংস্কার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এ লক্ষ্যে সরকারকে বেশ কয়েকটি বিষয়ে কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
১. চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ও ব্যাগ শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ-সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধান ও পদ্ধতির কতিপয় ক্ষেত্রে এখনো অস্পষ্টতা, জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অত্র খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ও ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়া অন্যান্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প বা তৈরি পোশাক শিল্পের অনুরূপ না হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যমান প্রজ্ঞাপন ও বিধিমালা ওই সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োগযোগ্য করা হয়েছে। এ কারণে সৃষ্ট জটিলতা দূরীকরণার্থে আসন্ন বাজেটে নীতিগত ঘোষণা প্রদানপূর্বক বস্ত্র খাতের মতো চামড়া, চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ও ব্যাগ শিল্পের জন্য একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র এসআরও জারি করা প্রয়োজন। এতে নীতিগত স্বচ্ছতা বাড়বে, ব্যাখ্যাগত জটিলতা ও প্রশাসনিক বিলম্ব কমবে, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস পাবে এবং ব্যবসা সহজীকরণ নিশ্চিত হবে। যা খাতটির জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক নীতিগত পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করবে।
২. চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ও ব্যাগ রফতানির ক্ষেত্রে বর্তমানে ১০ শতাংশ ও নন-লেদার পাদুকা ও পণ্যের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়। শিল্প খাতে এ স্থিতিশীল প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজতর হবে। নগদ সহায়তা এ খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোতে তারল্য সংকট, পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল ক্রয় এবং সার্বিক ব্যবসা পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এরই মধ্যে রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তার হার হ্রাসকরণের ফলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ব্যবসা পরিচালনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন, যার ফলে রফতানি আয় অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। এ নীতিসহায়তা না থাকলে এ খাতের অনেক কারখানা ব্যবসার মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়বে। চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ও ব্যাগ রফতানির ক্ষেত্রে বর্তমান ১০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা বহাল রাখা এবং নন-লেদার পাদুকা ও পণ্যের জন্য এ হার ২ থেকে ৪ শতাংশে উন্নতিকরণপূর্বক আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরসহ অন্তত পরবর্তী তিন অর্থবছর পর্যন্ত বহাল রাখা।
৩. তৈরি পোশাক শিল্পের মতো আমদানি নীতি আদেশ ২০২৫-২৭-এ চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ও ব্যাগ শিল্পকে ক্রেতা কর্তৃক বিনামূল্যে প্রেরিত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা প্রদান করে খাতভিত্তিক নীতিবৈষম্য দূর করতে হবে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার বাস্তবায়ন সহজ হবে ও রফতানি আয় বৃদ্ধি পাবে। চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ও ব্যাগ শিল্পকে ক্রেতা কর্তৃক প্রেরিত বিনামূল্যে কাঁচামাল আমদানির সুবিধা প্রদান করা হলে তাতে কোনো প্রকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাঠানো না হলেও এর মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন করে রফতানি করলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে।
৪. বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন আর বিকল্প নয়, বরং বাধ্যতামূলক বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবেশগত প্রভাবকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু সাভার লেদার এস্টেটের সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বাংলাদেশের চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ২৫ হাজার ঘনমিটার ট্যানারি বর্জ্য পানি পরিশোধনের জন্য এটি নির্মিত হলেও প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে অনেক কম সক্ষমতায় চলছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিবেশ মানদণ্ড পূরণ করা যাচ্ছে না এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সিইটিপি আধুনিকায়ন ও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা জরুরি। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ মানদণ্ডে অনুমোদিত করে এটিকে বিশ্বমানের করতে হবে এবং পরে পেশাদার বেসরকারি অপারেটরের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে। সরকারের কোনো সংস্থা যেমন বেপজার মাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে পরিবেশ সুরক্ষা, বাজারে প্রবেশাধিকার, রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে। সিইটিপি আধুনিকায়ন ও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করার লক্ষ্যে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পৃথকভাবে ১৫০ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করা এখন সময়ের দাবি।
৫. রফতানি খাতকে আরো শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তার ওপর আরোপিত কর স্থায়ীভাবে মওকুফ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বর্তমানে আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা-১১২ অনুযায়ী নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর কর্তন করা হয়ে থাকে, ফলে রফতানিকারকরা ঘোষিত প্রণোদনার পরিপূর্ণ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে আসন্ন বাজেটে ওই ধারা সংশোধন করে রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তার ওপর কর সম্পূর্ণরূপে মওকুফ করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। ওই সংশোধনীর ফলে রফতানিকারকরা ঘোষিত প্রণোদনার পূর্ণ সুফল ভোগ করতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের রফতানি খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
৬. চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতে দেশীয় বিনিয়োগ এখনো সীমিত এবং অনেকাংশে বিদেশী উৎসের ওপর নির্ভরশীল। অত্র খাতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বর্তমানে কোনো আলাদা ট্যাক্স হলিডে সুবিধা নেই। কিন্তু এ খাত থেকে রফতানি আয় বৃদ্ধি করতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিনিয়োগের বিপরীতে কর অবকাশ প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন প্রতিযোগী দেশ ভারত এ খাতের বিকাশে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের নানাবিধ প্রণোদনা প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশেও কাঁচামাল, উপকরণ ও যন্ত্রাংশের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানিনির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল আরো শক্তিশালী হবে। দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা নতুন উদ্যোক্তাদের এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।
বাংলাদেশের জন্য রফতানি বহুমুখীকরণ এখন আর নীতিগত আলচনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং অর্থনীতিতে টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত। কাঁচামাল আমদানির সুবিধা, বন্ড সংস্কার, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, সাশ্রয়ী ঋণ, কর অবকাশ ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো—এ সমন্বিত পদক্ষেপগুলো ছাড়া চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে না। তাই আসন্ন বাজেটকে হতে হবে রফতানি বহুমুখীকরণের বাজেট; অন্যথায় উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেও বৈদেশিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
উৎসঃ বণিক বার্তা





